চট্টগ্রাম ব্যুরো:
চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলায় গত ১১ মাসে সংঘটিত হয়েছে অন্তত ১৩টি হত্যাকাণ্ড। এর অধিকাংশই ঘটেছে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে। নিহতদের বড় একটি অংশ যুবদল, যুবলীগ বা অন্য রাজনৈতিক সংগঠনের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। অপরদিকে এলাকায় বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে সংঘাত, পাল্টাপাল্টি হামলা এবং দোষারোপের রাজনীতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত সময়ে রাউজান উপজেলায় ১৩টি হত্যার ঘটনায় ১৩টি মামলা দায়ের হয়েছে। এসব মামলায় বেশিরভাগেই আসামিরা এখনো শনাক্ত হয়নি, আর যেসব ঘটনায় নাম উল্লেখ ছিল, সেগুলোরও অধিকাংশ আসামি গ্রেপ্তার এড়িয়ে চলেছে।
গত এক বছরে নিহতদের মধ্যে শ্রমিক লীগ নেতা আবদুল মান্নান, যুবলীগ কর্মী মুহাম্মদ হাসান, ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম, মাওলানা আবু তাহের, প্রকৌশলী নূর আলম বকুল, যুবদল কর্মী কমর উদ্দিন জিতু, ইব্রাহিম, মানিক আবদুল্লাহ ও মুহাম্মদ সেলিম অন্যতম। এসব হত্যার মধ্যে অন্তত ৯টি ঘটনায় রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে।
স্থানীয় সুশীল সমাজের অভিযোগ, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় বেড়ে ওঠা একাধিক সন্ত্রাসী গ্রুপ রাউজানে নানা ধরনের অপরাধে জড়িত। রাজনৈতিক পরিচয়, ক্ষমতার লড়াই, টেন্ডার ও ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ, এমনকি পারিবারিক বিরোধকেও এখন রাজনৈতিক মোড় দিয়ে প্রতিপক্ষকে নির্মূল করার প্রবণতা বেড়েছে।
বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল রাউজানে পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করেছে। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী ও উত্তর জেলা আহ্বায়ক গোলাম আকবর খোন্দকারের অনুসারীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসে। এর জেরে দুই পক্ষ একাধিকবার মুখোমুখি সংঘর্ষে জড়িয়েছে, যা স্থানীয় প্রশাসন এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে উত্তর জেলা বিএনপির একাধিক নেতাকর্মী অভিযোগ করেন, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের দ্বন্দ্বের রেশ পড়ে গেছে基层 পর্যায়ে। গিয়াস কাদেরপন্থী ও গোলাম আকবরপন্থী নেতাকর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় মারামারি, স্লোগান-যুদ্ধ এবং হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটছে।
গত ২৯ জুলাই রাউজানের সত্তারঘাট এলাকায় দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে আহ্বায়ক গোলাম আকবর খোন্দকার আহত হন। এ ঘটনায় উভয় পক্ষ একে অপরকে দায়ী করে সংবাদ সম্মেলন করে। স্থানীয় বিএনপির একাংশ দাবি করেছে, কিছু হত্যা মামলায় তাদের নেতাকর্মীদের জড়ানো হচ্ছে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে।
এদিকে পুলিশের ভাষ্য, সংঘর্ষ বা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে অপরাধের প্রমাণ থাকলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে বাস্তবে দেখা গেছে, অধিকাংশ মামলাতেই তদন্ত ঝুলে থাকে অথবা অজ্ঞাত আসামিদের তালিকা দেখিয়ে দায়সারা ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
এ বিষয়ে একাধিক মানবাধিকার সংগঠনের নেতারা বলেছেন, রাজনীতির প্রভাব বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে জিইয়ে রেখেছে। এতে অপরাধীরা আরও সাহস পাচ্ছে, আর সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।
নিহতদের পরিবারগুলোর দাবি, অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হলে রাউজানের মতো এলাকায় খুনোখুনির এই ধারা থামবে না।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের মতে, রাউজানে শুধু রাজনৈতিক শান্তি উদ্যোগ নয়, প্রশাসনিক সক্রিয়তা, নিরপেক্ষ তদন্ত ও দ্রুত বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা সম্ভব।