২০২৪ সালের জুলাই মাস। বাংলাদেশের ইতিহাসে এক রক্তাক্ত, ত্যাগ-তিতিক্ষার এবং অবিস্মরণীয় গণজাগরণের মাস। এই মাসেই শুরু হয়েছিল এক ‘জুলাই বিপ্লব’, যার মাধ্যমে স্বৈরাচার, দলীয় দখলদারিত্ব, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে হস্তক্ষেপ এবং জুলুম-নির্যাতনের বিরুদ্ধে আলেম-ওলামা, মাদরাসার ছাত্র ও সাধারণ জনতা একত্রিত হয়ে রাস্তায় নেমে এসেছিল। দেশের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দেওয়ার এই গণআন্দোলনের বিজয়ের দিনগুলো আজও স্মরণে জাগায় রক্তিম সাহসের ধ্বনি।
জুলুম-নির্যাতনের পটভূমি
হেফাজতে ইসলামসহ বিভিন্ন ইসলামি দলের নেতাকর্মীদের ওপর সরকারের লাগাতার দমন-পীড়ন, গ্রেফতার, গুম, মিথ্যা মামলায় হয়রানি এবং কওমি মাদরাসাগুলোর ওপর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছিল এই আন্দোলনের মূখ্য অনুঘটক। মাদরাসাগুলোতে প্রশাসনের অনুপ্রবেশ, পাঠদান বন্ধে বাধা, আলেমদের অবমূল্যায়ন, এবং ইসলামী চেতনা দমনে সচেষ্ট নীতির প্রতিবাদে দেশজুড়ে অজান্তেই পুঞ্জিভূত হতে থাকে ক্ষোভ।
শহীদ ও কারাবরণ
চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নারায়ণগঞ্জ, সিলেট, নরসিংদীসহ বহু জেলায় পুলিশ ও সরকারদলীয় ক্যাডারদের গুলিতে শহীদ হন অনেক ছাত্র ও ওলামায়ে কেরাম। অনেকে এখনও নিখোঁজ, কেউবা পঙ্গু হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। ৫ আগস্ট পর্যন্ত গ্রেপ্তার হয়েছিলেন শতাধিক আলেম ও হাজারের বেশি ছাত্র। হাটহাজারী, লালবাগ, সাতকানিয়া, বায়তুল মোকাররম ছিল মূল প্রতিরোধের ঘাঁটি।
বিশিষ্ট আলেম মাওলানা ইউসুফ হুজুর, হাটহাজারীর শায়খুল হাদীস আল্লামা শফি মাদানী, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাওলানা তানভীর আলীসহ অনেকেই গ্রেফতার হন এবং কারাবরণ করেন। ঢাকা থেকে শুরু করে চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল এই জুলুম।
ছাত্রদের সাহসী অংশগ্রহণ
কওমি মাদরাসার ছাত্ররাই ছিলেন এই বিপ্লবের মূল প্রেরণা। শহরের গরম গলির মোড় হোক, কিংবা গ্রামের বাঁশের সাঁকো — সর্বত্র মিছিল, স্লোগান ও তৌহিদি গর্জনে মুখর ছিল। ছাত্ররা তাদের জান দিয়ে প্রমাণ করেছিল, দেশপ্রেম ও ঈমানি শক্তিই পারে কোনো জাতিকে জেগে তুলতে।
রাজনৈতিক ও সামাজিক দলগুলোর ভূমিকা
এই গণজাগরণে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, বাংলাদেশ ছাত্র মজলিস, আনসারুল ইসলাম, ইসলামী ঐক্যজোটসহ অনেক দল ও সংগঠন কার্যত রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে। যদিও জামায়াতে ইসলামি প্রথমে নিষ্ক্রিয় থাকলেও পরে অনানুষ্ঠানিকভাবে আন্দোলনে সহানুভূতি প্রকাশ করে।
শেখ হাসিনার দাম্ভিকতা ও পরিণতি
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রথম দিকে এই আন্দোলনকে ‘উগ্রবাদী মৌলবাদী গোষ্ঠীর চক্রান্ত’ বলে দাবি করেন। কঠোর অবস্থানে থেকে পুলিশের ওপর হত্যাকাণ্ড চালানোর অনুমতি দেন। কিন্তু দ্রুতই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। লাখো মানুষের অংশগ্রহণে ঢাকাসহ সারা দেশে অবরোধ, হরতাল, গণমিছিল শুরু হয়। একপর্যায়ে জনরোষের মুখে হাসিনা সরকার রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়ে।
বিশ্বজনমতের চাপে ও গোয়েন্দা রিপোর্টের ভিত্তিতে শেখ হাসিনা নিরাপত্তার জন্য গোপনে ধানমণ্ডির বাসভবন ত্যাগ করে আশ্রয় নেন সাময়িক একটি সামরিক স্থাপনায়। সরকার পতনের গুজব ও আন্দোলনের তীব্রতা তাকে একপ্রকার আত্মগোপনে যেতে বাধ্য করে। ওই সময় সরকারের অনেক শীর্ষ কর্মকর্তা পদত্যাগ করেন। এই ধাক্কাতেই ‘জুলাই বিপ্লবের বিজয়’ চূড়ান্ত রূপ পায়।
চূড়ান্ত বিজয়ের প্রতীক
৫ আগস্টের মধ্য দিয়ে তীব্রতম আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় সরকার প্রশাসনিকভাবে নতিস্বীকার করতে বাধ্য হয়। হাজারো মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার, আলেমদের মুক্তি, দমননীতি পরিবর্তন এবং কওমি শিক্ষাব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ না করার লিখিত ঘোষণা আসে। এরপর থেকে ৫ আগস্টকে ‘জুলাই বিপ্লবের বিজয় দিবস’ হিসেবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালন করে আসছে দেশজুড়ে তৌহিদি জনতা।
এই বিজয় শুধুই একটি রাজনৈতিক সাফল্য নয়, বরং এটি ছিল ঈমান, আত্মত্যাগ ও নেতৃত্বের মহাসংগ্রামের এক জ্বলন্ত সাক্ষ্য। ইতিহাসে এমন ঘটনা খুব কমই ঘটে, যেখানে ছাত্র, আলেম ও জনতা এক কণ্ঠে শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় এবং বিজয় ছিনিয়ে আনে।